
১।।
ট্রাক স্টান্ডের কোণে ইউনিয়ন অফিসের পাশ ঘেঁষা জমিরের চায়ের দোকানে সকাল থেকে বসে আছে মুরাদ। কাল রাতে সামান্য বৃষ্টি হয়েছে, আকাশ মেঘলা হয়ে আছে এখনও। অক্টোবর মাসে এমন বৃষ্টি সাধারনত হয় না। বৃষ্টির সাথে সাথে কিছুটা শীতও যেন নেমে এসেছে শহরের বুকে। চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে এক পা তুলে দিয়ে জমিরকে এক কাপ চা দিতে বলে একটা সিগারেট ধরাল মুরাদ।এমন বৃষ্টির দিন এলেই তার মনটা আজও কেমন উদাস হয়ে আসে, তার উপর আজকে কোন ট্রিপ নেই মুরাদের। গতকাল রাতে সিরাজগঞ্জ থেকে সবজির ট্রাক নিয়ে ঢাকা এসেছে সে। মাল খালাস শেষে আজকে সকালে ফিরে যাবার কথা ছিল। রাতেট্রাকেই ঘুমিয়েছে। বৃষ্টির কারনে ঘুমটা বেশ ভালই হয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠতেই হেল্পার লোকমান এসে বলল – ওস্তাদ আইজ আর ট্রিপ মারন লাগব না। আইজগা অবরোধ। আর একটু খোঁজ খবর নিয়ে মুরাদ বুঝল কথাটা ঠিক। তাই চায়ের দোকানে এসে বসে আছে। ইউনিয়ন অফিস ও ফাঁকা, সব নেতা, শ্রমিক, ড্রাইভার মিলে নাকি অবরোধ পালনে গেছে। তাকেও অবশ্য এরই মাঝে দুই পার্টি ডেকে গেছে। “আসতাছি” বলে আর যায় নি সে।
২।।
চা খেতে খেতেই আবার বৃষ্টি নামল। আর একটা সিগারেট ধরাল মুরাদ। মনটা আজ বেশি উদাস হয়ে যাচ্ছে। বারবার হাসনার কথা মনে পড়ছে। আজ থেকে বছর ছয়েক আগে এমনই এক বৃষ্টির দিনে হাসনার বিয়ে হয়ে গেল। পাত্রও ড্রাইভার, তবে ঢাকায় থাকে, নিজের গাড়ি চালায়। মুরাদ শুনেছিল বিয়েটা হচ্ছে। কিন্তু তা নিয়ে সে মাথা ঘামায়নি, সে পড়ে ছিল বাংলা মদের বোতল নিয়ে মধ্যপাড়ায়। কেউ তাকে জানায় নি, আসলে জানানো তো দুরের কথা, বরং বিয়ের দশদিন আগেই হাসনার চাচা লোক মারফত তাকে জানিয়ে দিয়েছিল এই দশদিন যদি মুরাদ হাসনাদের বাড়ির ধারে কাছেও যায়, তবে জেলের ভাত খাওয়া লাগবে। মুরাদ হিসেব কষে বুঝেছিল, জেলের ভাত খাওয়ার থেকে বাংলা মদ খাওয়া ঢের ভাল।সিগারেট টানতে টানতে মুরাদ ভাবে, এই ছয় বছরে হাসনার কি হল? নিশ্চয়ই ছেলে মেয়ে হয়েছে, হয়ত খানিকটা মোটাও হয়ে গেছে। তবে সুখে আছে নিশ্চয়ই। যার স্বামী নিজের গাড়ি চালায় সে নিশ্চয়ই খারাপ থাকবে না, নাকি স্বামী তাকে ভালবাসে না? অত্যাচার করে ? মনে মনে নিজেকে খানিকটা গালি দেয় মুরাদ। পরের গাড়ি চালায় তো, খালি ছোটলোকি চিন্তা মাথায় আসে। আচ্ছা হাসনা তো এই ঢাকাতেই থাকে। যদি কখনও পথে দেখা হয়, সে কি চিনতে পারবে? মনে হয় না, আবার চিনতেও পারে। কতদিন দুজন দুজনের চোখে চেয়ে থেকেছে। মুরাদ তো চাইলেই এখনও হাসনার মুখটা মনে করতে পারে, তবে হাসনা কেন পারবে না?
৩।।
“এই বেডা, তুই বইয়া রইছস ক্যা?” । আচমকা ধমকে হুঁশ ফেরে মুরাদের। তাকিয়ে দেখে রমজান খান দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। খান সাহেব বড় মানুষ, ইউনিয়নের বড় নেতা। বেঞ্চ থেকে নেমে দাঁড়ায় মুরাদ। খান সাহেব বলেন “আয় আমাগো লগে, অবরোধ করতে হইব”। মুরাদ লক্ষ্য করে দেখে খান সাহেবের পিছনে আরোও আঁট দশজন দাঁড়ানো। খান সাহেবকে না করা ঠিক হবে না বুঝতে পারে সে। আজকে না করলে হয়ত সে আর ট্রাক নিয়ে ঢাকায় আসতেই পারবে না। খান সাহেবের পিছে পিছে রওয়ানা দেয় সে। কেউ একজন তার হাতে একটা বালতি ধরিয়ে দেয়। মুরাদ বুঝতে পারে বালতি ভর্তি পোড়া মবিল। আরও লোক বাড়ে, কেউ কেউ স্লোগান দেয় “আমাদের নেতা জিন্দাবাদ, আমাদের নেতা অমর হোক”। জোর পায়ে হেঁটে মিছিলটা এগিয়ে যায় মেইন রোডের দিকে। মেইন রোডে উঠতেই একটা লেগুনাকে ধরে ফেলে কয়েকজন। এত বড় সাহস। অবরোধে গাড়ি চালায়। শাস্তি হিসাবে মুখে কালি আর কান ধরে ওঠবস। এত এত লোকের উৎসাহ চেঁচামেচিতে গায়ে কেমন একটা জোস চলে আসে মুরাদের। কেমন যেন এক পাশবিক শক্তি ভর করে তার মাঝে। একটা সিএনজি আসছিল। কয়েকজন দৌড়ে গিয়ে থামাল সেটা। দরজা খুলে বের করে আনল ড্রাইভার কে। ড্রাইভার হাত জোড় করে কি যেন বলছিল। মুরাদ খালি শুনতে পারে “…পোলাডা অসুস্থ…আমারে কিছু কইরেন না…” পোড়া মবিলের বালতি হাতে এগিয়ে যায় মুরাদ। সিএনজির পিছন থেকে একটা বাচ্চা জোরে কেঁদে ওঠে। মুরাদ দেখে বাচ্চাটা তার মাকে জোরে জড়িয়ে ধরেছে, আর মহিলাটা দরজা খুলে বের হয়ে আসতে চাচ্ছে। নিজের হাতে পোড়া মবিল মাখায় মুরাদ। এসব পাত্তা দিলে হবে না। ড্রাইভার তখন কেঁদে কেঁদে একি কথা বলে যাচ্ছে। আচমকা মহিলাটা দৌড়ে এসে মুরাদের হাতটা ধরে ফেলে। মহিলার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে মুরাদ । এত গুলো বছর চলে গেলেও ঠিকই চেনা যায়, সেই চেহারা, সেই চোখ। নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেয় মুরাদ। পোড়া মবিলটা ডলে নেয় নিজের মুখে। তারপর মাথা নিচু করে হাটা শুরু করে। এই মুখ কালিতে ঢাকা থাকাই ভাল।
বিদ্রঃ গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক, কারো সাথে মিলে গেলে বা আঘাত পেলে তা অনভিপ্রেত কাকতাল মাত্র। এজন্য লেখক দায়ী নহে।
Leave a Reply