
১।।
রোজকার অফিস শেষে লোকাল বাসে ঝুলে দুঘণ্টার জ্যাম পেরিয়ে ক্লান্ত শ্রান্ত হরিপদ বাবু যখন মতিঝিল থেকে মোহাম্মদপুরে তার বাসায় পৌঁছালেন, ততক্ষনে রাত হয়ে গেছে। সওদাগরী অফিসের চাকরি, তার সময়ের ঠিক ঠিকানা নেই। তার উপর আজকে আবার অফিসের বড় বাবুর মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ছিল। প্রতিদিনই থাকে, তবে আজকে কিছুটা বেশি। অফিস শেষে হরিপদ বাবু যখন বের হব হব করছেন, তখন আচমকা বড়বাবুর মনে হল হরিপদ বাবু কি কাজ করেন তার ফিরিস্তি নেওয়া দরকার। মিনিট ত্রিশেক নানা রকম বয়ান শেষে বড়বাবু নিজেই ক্লান্ত হয়ে শেষমেষ হরিপদ বাবুকে একদিনের সময় দিয়ে বিদায় করেছেন। এই একদিনের মধ্যে হরিপদ বাবু কি কাজ করেন, আর অফিসে কি অবদান রাখেন তার বিস্তারিত লিখে জানাতে হবে, নাহয় চাকরি নট।
অফিসে বড় বাবুর ধাতানি খেয়ে হরিপদ বাবুর মেজাজ গেল বিগড়ে। বছরের এই সময়টাতে এমনিতেই হালকা গরম পড়া শুরু করেছে। একটু হাঁটলেই গায়ে চিটচিটে ঘাম জমছে, শীত শীত লাগছে আবার গলাও শুকিয়ে যাচ্ছে। বাসায় ফিরে জামা কাপড় ছেড়ে গিন্নিকে ডেকে এক কাপ চা দিতে বলে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন হরিপদ বাবু। এমন সময় চিঁ চিঁ করে গিন্নি ছুটে এল। গিন্নির গলা তো নয়, যেন ফাটা বাঁশের বাঁশি। সেই গায়ে হুল ফোটানো চিঁ চিঁ স্বরে গিন্নি বললেন- বলি অফিস থেকে এসে শুয়ে পড়লে কি শখে? চা যে বানিয়ে আনব, তা কি হাওয়া থেকে? সকাল বেলা যে বাজারের লিস্টি দিয়েছিলুম তা কি গুলে খেয়েছ? বলি লজ্জা করে না? সারাদিন বাহিরে ঘুরাঘুরি করে, আবার বাসায় এসে হাত পা ছড়িয়ে আয়েশ করতে? হরিপদ বাবু চুপচাপ উঠে পড়লেন। সারাদিন অনেক হ্যাপা সামলেছেন। আর না। জীবনটা যদি সিনেমা হত তবে তার মাথা দিয়ে এখন ধোঁয়া বের হত। কিন্তু জীবন সিনেমা নয়। তাই গায়ে একটা জামা চড়িয়ে, বাজারের লিস্ট আর ব্যাগ হাতে বাসা থেকে বের হয়ে পড়লেন। হাঁটতে হাঁটতে গলির মুখে চায়ের দোকানটার সামনে আসতেই কে যেন ডাক দিল – আরে হরিপদ না? বলি এত রাতে কোথায় যাচ্ছ ভায়া? খেয়াল করে তাকাতেই দেখলেন তার বন্ধু ও প্রতিবেশী অমল বাবু। হরিপদ বাবু একবার ভাবলেন জবাব না দিয়ে চলে যাবেন, কিন্তু তা আর হল না। অমল বাবু জোর করে ডেকে বসালেন, আর চায়ের অর্ডার দিলেন। এরপর বললেন- কি ভায়া আজ আবার গিন্নি বের করে দিয়েছে বুঝি? বলি তুমি পারো কি ভাবে ভায়া? এমন আগ্নেয়গিরি নিয়ে সংসার কি ভাবে কর? অমল বাবু তার প্রতিবেশী, তাই সংসারের হাল কমবেশি জানেন। তাই বলে এমন চায়ের দোকানে বসে সবার সামনে খোঁটা দেওয়া, হরিপদ বাবুর মেজাজ আরও গরম হয়ে গেল। কোন জবাব না দিয়ে, কাপের চায়ে একটা চুমুকও না দিয়ে উঠে পড়লেন।
২।।
বাজারে এসে হরিপদ বাবু ঘুরে ঘুরে একটা দোকানে গিয়ে লিস্ট ধরে ধরে সবকিছুর অর্ডার দিলেন । কিন্তু কথায় বলে না, খারাপ সময় একা আসে না। সব কিছু ব্যাগে ভরে দাম দিতে গিয়ে হরিপদ বাবু দেখলেন ভুলে মানিব্যাগটাই নিয়ে আসেননি। অপরিচিত দোকানদার। কাজেই বাকি দেবার প্রশ্ন উঠেই না। ব্যাগ ভর্তি বাজার দোকানে রেখে, হরিপদ বাবু বাসার দিকে রওয়ানা হলেন মানিব্যাগ নিয়ে আসতে। হাঁটতে হাঁটতে অনেক চিন্তা খেলা করে যাচ্ছিল হরিপদ বাবুর মাথায়। বারবার মনে হচ্ছিল সেই ব্যাচেলর জীবনের কথা। কতই না সুখের জীবন ছিল। এরপর চাকরিতে ঢুকলেন, বিয়ে করলেন। যতই চিন্তা করছিলেন, রাগে দুঃখে নিজের মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছিল তার। বাসার গলির সামনে আসতেই দেখলেন অমল বাবু এখনও চায়ের দোকানে বসে আছেন। সাথে আরো দু একজন। কথাবার্তার মাঝে দুয়েকবার নিজের নামটাও শুনলেন। বুঝলেন তাকে নিয়ে কথা হচ্ছে। ক্ষোভে দুঃখে আবার উল্টো পথ ধরলেন হরিপদ বাবু। না এমন জীবন রাখার কোন মানে হয় না।রাগের মাথায় হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে হরিপদ বাবু চলে এলেন সংসদ ভবনের সামনে। রাত প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। একটু নিরিবিলি দেখে ফুটপাথের একটা কোনে বসে পড়লেন। তারপর ভাবতে থাকলেন কি করা যায়। একবার ভাবলেন এই জীবনই আর রাখবেন না। তারপর মনে হল সাধু সন্ন্যাসী হয়ে যাবেন। তারপর মনে হল ভূটান চলে যাবেন। এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে রাত বারোটা বেজে গেছে খেয়াল ছিল না। উঠে পড়ে, আবার হাঁটতে শুরু করলেন। কই যাবেন জানেন না। লক্ষ্যবিহীন ভাবে হাঁটছেন আর চিন্তা করছেন। এই যে মনুষ্য জীবন, কি তার মানে? হাঁটতে হাঁটতে বাণিজ্য মেলার মাঠে চলে এলেন হরিপদ বাবু। এমনিতে এদিকটাতে রাতের বেলায় কেউ আসে না। চুরি ছিনতাই এর ভয়ে। কিন্তু আজকে হরিপদ বাবু ভয়শুন্য। খানিকটা বিবাগী ভাব চলে এসেছে। এর মাঝে আকাশে চাঁদের উজ্জলতা যেন আরো বেড়েছে। আশে পাশে লোকজন নেই। জায়গাটা বেশ ভাল লেগে গেল হরিপদ বাবুর। জ্যোৎস্নালোকিত খোলা প্রান্তর, মৃদু মন্দ দখিনা হাওয়া, ওদিকে পেটে ক্ষুধা, দুপুরের পর থেকে আর কিছু খাওয়া হয়নি। এমন অবস্থায় স্বভাবজাত ভাবেই বাঙালি দার্শনিক হয়ে ওঠে। হরিপদ বাবুর বেলায়ও তার ব্যাতিক্রম কিছু হল না। মাঠের মাঝে এক ঝোপের পাশে একটা ইটের পাঁজা দেখে সেটার উপর বসে পড়লেন। বসে বসে অনেক ভেবে হরিপদ বাবু এক দার্শনিক সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন- “মনুষ্য জীবন মানেই হল কিছু প্রশ্নের উত্তর খুজে বেড়ানো”। আরকেটু চিন্তা করে বুঝলেন খালি মানুষ না, সকল প্রানের উদ্দেশ্যই হল সারাজীবন ধরে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়ানো। যেমন একটা কুকুর সকাল থেকে একটাই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে, “কোথায় গেলে খাবার পাব?” । মানুষও তাই। কেউ খোঁজে খাবার, কেউ খোঁজে সাফল্য, বেকার খোঁজে চাকরি, ব্যাচেলর খোঁজে বাসা, বিবাহিত খোঁজে শান্তি।নিজের কথা ভেবে দেখলেন। সেই সকাল থেকে কত কত প্রশ্নের মুখে পড়তে হল তাকে। অফিসে কি করেন? কাজ করেন না, তো অফিসে আসেন কেন? বাজার নিয়ে আসনি, চা খেতে চাও কেন? এমন বউ নিয়ে সংসার কিভাবে কর? এমনকি নিজেও নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, এত কিছুর পরেও বেঁচে আছেন কেন? এত এত প্রশ্ন, কিন্তু উত্তর নেই। বাসায় ফিরলেই আবার শুরু হবে প্রশ্ন, অফিসে গেলে দিতে হবে প্রশ্নের জবাব। এই প্রশ্ন আর তার উত্তরের খোঁজ এর কি কোন শেষ আছে? কেউ কি পেরেছে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে? মনে হয় না। তারপর তার মনে হল আসলে সব প্রশ্নের কি উত্তর হয়? সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলে কি জীবন এমনই থাকে? এই সব ভাবতে ভাবতে বসা অবস্থা থেকে সেই ইটের পাঁজার উপর শুয়ে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়লেন হরিপদ বাবু।
৩।।
কতক্ষন ঘুমিয়ে ছিলেন মনে নেই হরিপদ বাবুর। আচমকা একটা উজ্জ্বল আলোর ঝলকানিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল তার। প্রথমটায় ভাবলেন কোন গাড়ির হেড লাইট বুঝি। কিন্তু আলোটা আসছে আকাশের দিক থেকে। ওদিকে চাঁদটা ততক্ষনে ডুবে গেছে। আর এই আলো চাঁদের আলোর মত মোলায়েমও নয়। কেমন একটা হুল ফোটানো ভাল আছে। একহাতে চোখ ঢেকে একটু ভালমত আলোর উৎসটা বোঝার চেষ্টা করলেন। কিন্তু আলোটা স্থির নয়। ধীরে ধীরে আকাশ থেকে নেমে এল মাঠের উপর। হরিপদ বাবু একবার ভাবলেন, হেলিকপ্টার নাকি? এদিকটাতে মাঝে মাঝে হেলিকপ্টার নামে বটে, কিন্তু হেলিকপ্টার হলেতো শব্দ হত। এর কোন শব্দ নেই। আলোটা হরিপদ বাবুর থেকে হাত বিশেক দূরে ধীরে ধীরে মাঠের উপর নেমে স্থির হল। তারপর আলোর তীব্রতা কমে এল। তীব্র আলোর বদলে একটা হাল্কা মৃদু আলো দেখা যাচ্ছে এবার। সেই আলোতে যে জিনিসটা দেখা গেল সেটা কোন হেলিকপ্টার নয়। এই জিনিসটা না হোক, এই রকম দেখতে জিনিস হরিপদ বাবু অনেক দেখেছেন। নানা রকম হলিউডি বলিউডি সিনেমায়। নামটা মনে করার চেষ্টা করলেন। হ্যা উড়ন্ত চাকি, মানে কিনা ফ্লাইং সসার ওরফে UFO । ভিনগ্রহীদের নভোযান।উত্তেজনায় শিহোরিত হলেন হরিপদ বাবু। ভয়ও লাগছিল। সিনেমা দেখে দেখে জানেন এই ভিনগ্রহীরা ভালও হয় খারাপ ও হয়। কি আছে আজকে তার কপালে কে জানে। এক দৌড়ে পালাবেন কিনা ভাবলেন। পরক্ষনেই নিজের গিন্নির কথা মনে হতে, দৌড়ে পালানোর চিন্তা বাদ দিলেন। গিন্নির থেকে এলিয়েন ভাল, যা আছে কপালে মনে মনে এই চিন্তা করে উঠে দাড়ালেন তিনি। মিনিট দুয়েক নিঃশব্দে কেটে গেল। এরপর চিং করে একটা শব্দের সাথে একটা গোলমত ঢাকনা খুলে চাকির ভিতর থেকে একটা প্রানী বেরিয়ে এল। এরপর প্রানীটা ধীরে ধীরে হেঁটে হরিপদ বাবুর সামনে এসে দাড়াল।এবারে কিন্তু হরিপদ বাবু ভয়ের বদলে বেশ কিছুটা অবাকই হলেন। টিভি সিনেমায় ভিনগ্রহী বলতে যেমন বোঝায় এ একদমই তেমন না। এই ভিনগ্রহী দেখতে মানুষের মতই। খালি মাথার খুলিটা একটু বড়, চোখে পাতা নেই, গায়ের রঙ এই মৃদু নীলাভ আলোয় তার লাল বলেই মনে হল। আর হ্যা হাতে তিনটে করে আঙ্গুল, গায়ে চকচকে একটা পোষাক। হাতে তিনটে করে আঙ্গুল না হলে হয়ত তিনি একে ভিনগ্রহী বলে বিশ্বাসই করতেন না। ভিনগ্রহী এবার তার সামনে এসে পরিষ্কার বাংলায় বলল “মিস্টার হরিপদ, আপনার সাথে কি একটু কথা বলতে পারি?”
৪।।
হরিপদ বাবুর আবার একবার মনে হল, এটা কোন বিচ্ছিরি রকমের মজা নয় তো? আজকাল তো এমন হামেশাই ঘটছে, প্রাংক না কি জানি বলে। কিন্তু ওই বিশ হাত দূরে দাঁড়ানো উড়ন্ত চাকি, হাতের তিন আঙ্গুল, চোখের পাতা না থাকা এ কিভাবে সম্ভব। আবার ভিনগ্রহী তার নামও জানে। এটা তো অবাক করার মত ব্যাপার। এবার ভিনগ্রহী বলল- আপনি অবাক হবেন না। প্রযুক্তিগত উন্নতির কারনে আমি আপনার মনের ভাব বুঝতে পারছি, আর আপনার ভাষায় কথাও বলতে পারছি। আমি এসেছি কুড়ি আলোকবর্ষ দুরের ম্যাক্রোকসম গ্রহ থেকে আর আমার নাম ইনকংরুয়াশ, আপনি আমাকে কং নামে ডাকতে পারেন। ভিনগ্রহী কংয়ের আন্তরিক কথায় হরিপদ বাবুর ভয় কেটে গেল। তিনি বললেন – মিস্টার কং, তোমার সাথে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম। তোমার জন্য কি করতে পারি? এবারে কং বলল – সে অনেক কথা। বলতে গেলে রাত ফুরিয়ে যাবে। তাই সংক্ষেপে বলছি। আমাদের গ্রহে সব কিছু আছে, অফুরন্ত শক্তি, খাবার, পানি। কায়িক পরিশ্রম কারো করা লাগে না। অসুখে কেউ মরে না। কিন্তু সবকিছু থাকার পরও আমাদের গ্রহের মানুষ এর মনে সুখ নেই। আমাদের ইন্টালস্টেলার গবেষকেরা অনেক গবেষণার পর তোমাদের এই গ্রহ, বিশেষ করে তোমাদের এই দেশের মানুষের মাঝে সুখের পরিমাণ অনেক বেশী বলে খুঁজে পেয়েছে। তাদের প্রতিনিধি হিসাবে আমি এসেছি এখানকার মানুষের সুখের কারন খুঁজতে। পেশায় আমি একজন সাংবাদিক। আমি এদিকেই আমার নভোযানে ঘুরছিলাম। এমন সময় তোমাকে আমার রাডার সনাক্ত করল। হরিপদ বাবু খানিকটা বিরক্ত হলেন। তিনি ভেবেছিলেন এই ভিনগ্রহী কং এর কাছ থেকে কিছু মূল্যবান জ্ঞান পাবেন, কিন্তু এ ব্যাটা তো নিজেই সুখের খোঁজ করে বেড়াচ্ছে।এ সেই পুরান প্যাচালের মত শুনাচ্ছে। এই এক বস্তা পচা প্লটের উপর এই বাংলারই অনেক কবি সাহিত্যিক অনেক কবিতা উপন্যাস গল্প রচনা করে গেছেন। তবে ভিনগ্রহী সাংবাদিকের কথা কেউ লিখেছে কিনা মনে করতে পারলেন না। যাই হোক নিজের বিরক্তি চেপে তিনি জিজ্ঞেস করলেন – এত এত লোক থাকতে তোমার রাডার আমাকেই খুঁজে পেল কেন? জবাবে কং বলল – আগেই বললাম আমাদের প্রযুক্তির কল্যানে আমরা মানুষের মনের ভাব বুঝতে পারি। অফিস থেকে তুমি যখন ফিরছ তখন থেকে আমি তোমার মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষন করছি। তোমার মনে অনেক কষ্ট সেটাও বুঝেছি। কিন্তু ধীরে ধীরে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম খালি পেটে , আকাশের একটি উপগ্রহের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে তোমার মনের কষ্ট দূর হয়ে গেল। তোমার ব্রেন স্যিগনালে অনেক রকম উন্নত দার্শনিক চিন্তার আভাস আমার রাডারে পেলাম। কিন্তু আমার যন্ত্র থেকে কোন ভাবেই বুঝতে পারছি না তুমি কিভাবে এটা করলে? এমনকি তোমার এই কেস স্টাডি গবেষণা করে আমদের বিজ্ঞানীরাও এখনও বুঝতে পারছেন না, আমাদের আলট্রা হাইপার সুপার কম্পিউটার ও এর কারন ধরতে পারছে না।
এবারে হরিপদ বাবু খানিকটা অবাকই হলেন। জিজ্ঞেস করলেন – কি বুঝতে পারছ না? উত্তরে কং বলল – এই মাঠে এসে তোমাদের গ্রহের একমাত্র উপগ্রহটির দিকে তাকিয়ে থেকে যে তোমার মনের ভাব পরিবর্তীত হল সেটা আমরা ধরতে পেরেছি। কিন্তু এই যে পেটে ক্ষুধা নিয়ে, মনে কষ্ট নিয়ে তুমি এই খোলা মাঠে কেন এলে সেটা বুঝতে পারছি না। এমন সময় কং এর কানে লাগানো কি একটা যন্ত্রে আলো জ্বলে উঠল। অংবং ধরনের কি কি সব শব্দ ভেসে এল। হরিপদ বাবু বুঝলেন এটা কোন এক ধরনের ইয়ার ফোন আর তাতে কোন বিপদের আভাস দেয়া হচ্ছে। এদিকে কং ভীত চোখে এদিক ওদিক কয়েকবার তাকালো, তারপর একদম হরিপদ বাবুর সামনে এসে তার হাতটা ধরে বলল – তোমাকে আমার অনুরোধ দয়া করে দ্রুত আমাকে উত্তরটা বল। তোমাদের ডিফেন্স ফোর্স আমার নভোযান দেখতে পেয়ে গেছে। আমার হাতে সময় নেই। দয়া করে আমাকে বল কেন তুমি বাসায় তোমার পার্টনারের কাছে ফিরে না গিয়ে এই এত রাতে এই খোলা মাঠে এসেছিলে?? তোমার এই উত্তরের উপর নির্ভর করছে আমাদের গ্রহের ভবিষ্যৎ। বলো, আমাকে বল।
কি উত্তর দেবেন ভেবে পেলেন না হরিপদ বাবু। এমন গুরুত্বপূর্ন প্রশ্নের মুখোমুখি তিনি কখনও পড়েননি। এই উত্তরের উপর নাকি কুঁড়ি আলোকবর্ষ দুরের কোন এক গ্রহের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ওদিকে সময় নেই, কং তার হাত ধরে ঝাঁকি দিচ্ছে। একটু আমতা আমতা করে তিনি বললেন- আমার ভাল্লাগে। এই মনে করেন খুশিতে, ঠেলায়, ঘোরতে… কং কি বুঝল কে জানে, হরিপদ বাবুর হাতে একটা শেষ ঝাঁকি দিয়ে বলল – আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আপনার উত্তর নিয়ে আমাদের বিজ্ঞানীরা গবেষনা করে দেখবে। এবার আসি। বলেই কং দৌড়ে গিয়ে তার নভোযানে উঠে মুহুর্তের মাঝে আকাশে মিলিয়ে গেল। হরিপদ বাবুও নিজের বাসার দিকে পা বাড়ালেন। কুড়ি আলোকবর্ষ দুরের ম্যাক্রোকসম গ্রহের অধিবাসীদের ভবিষ্যৎ কি হবে তা হয়ত তার আর কোন দিন জানা হবে না। আপাতত তিনি নিজের ভবিষ্যত নিয়ে বড়ই চিন্তিত অনুভব করছেন। তার আর খুশিতে, ঠেলায় ঘোরতে ইচ্ছে করছে না।
Leave a Reply