হারানো প্রেম

“হেই মামা, দেইখা পা ফালান, আমার দোকানের উপর উইঠা পড়ছেন…”ঢাকার ব্যস্ত অফিস পাড়ার ফুটপাথে হাঁটতে গিয়ে আচমকা এমন ধমক খেয়ে চমকে ওঠে শফিউল। মাত্রই একটা অফিসে চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে বের হয়েছে। চাকরিটা হবে কি হবে না, সেই চিন্তা করতে করতে একটু আনমনা হয়ে গিয়েছিল, আর তখনই ভুল করে ফুটপাথের কোন দোকানের উপর উঠে পড়েছে। ভুল বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি সরে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলতে গিয়ে শফিউল দেখল তার পাশ ঘেঁষে ফুটপাথে একটা পাগল বসে আছে। পাগলটার গায়ে ছেড়া ফাটা নোংরা জামাকাপড়, চুল দাড়ি বড় হতে হতে ময়লা জড়িয়ে জটা পাকিয়ে গেছে, শরীর থেকে কেমন একটা বোটকা গন্ধও আসছে। নাক কুঁচকে নিচের দিকে তাকিয়ে শফিউল দেখল পাগলটার সামনে ফুটপাথ জুড়ে হরেক রকমের জিনিসপত্র থরেথরে সাজানো। ঠিক যেমন করে ফুটপাথের হকাররা মালপত্র সাজায় তেমনি। তবে সে সব জিনিস পত্রের সবই ফেলনা, যেমন ফেলে দেওয়া চিপসের প্যাকেট, ভাঙ্গা কাঁচের বোতল, কলার খোসা, গাছের বিবর্ণ হলুদে পাতা, ছেড়া পোস্টার, ইটের টুকরো এইসব। শফিউলের পায়ে লেগে কয়েকটা বোতল গড়িয়ে পড়েছিল, পাগলটা এবার আপনমনে সেইসব বাতিল জিনিস গুছিয়ে রাখতে লাগল। শফিউলও আর দাঁড়াল না, তার বদলে কয়েক পা হেঁটে একটু সামনে এগিয়ে এসে ফুটপাথের চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে একটা চায়ের অর্ডার দিল।

সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি, তাই চায়ের কাপে চুমুক দিতেই পেটের ভিতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। এই ব্যাপারটা এখন অবশ্য গা সওয়া হয়ে গেছে। মাসে দুটো টিউশনি করিয়ে সামান্য যে টাকাটা সে পায়, তার থেকে বাড়িতে টাকা পাঠানোর পর আর তেমন কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তার উপর মেসের ভাড়া, চাকরির আবেদন ফি, বাসের ভাড়া আরও কত রকমের খরচ। কয়েকমাস ধরে বাড়িতে বাবার শরীরটা খারাপ যাচ্ছে, তাই খরচটা আরও বেড়েছে। কিছুদিন ধরে তাই সকাল বেলা না খেয়ে একবারে দুপুরে এক কাপ চা আর সাথে একটা পাউরুটি বা বিস্কিট খেয়েই কাটাচ্ছে শফিউল।

ইন্টারভিউ দিতে ঢোকার সময় মোবাইল ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখেছিল। এইবেলা চা খেতে খেতে পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখল দুটো মেসেজ এসেছে, দুটোই তানিয়ার নাম্বার থেকে। সেই একই প্রশ্ন- “কেমন হল ইন্টারভিউ ? চাকরি হবে কিনা?” এইসব। কি উত্তর দেবে ভেবে পায় না শফিউল। ভালো ইন্টারভিউ তো কতোই দিল, কিন্তু চাকরি হলনা এখনো। এবারেও হবে বলে মনে হয় না। তানিয়ার ব্যাকুলতাটা বুঝতে পারে সে, বেশ কিছুদিন ধরেই তানিয়ার বাসা থেকে পাত্র খোঁজা চলছে। মাঝেমাঝে শফিউলের ইচ্ছে হয় তানিয়াকে বলে, যেন তাকে ভুলে যায়, বিয়ে করে নিজের মত সুখে থাকে। কিন্তু সেটাও আর হয়ে ওঠে না। হতাশার অন্ধকারে চাপা পড়ে মরতে বসা শফিউলের জীবনে তানিয়াই যে একমাত্র আশার আলো। তানিয়াকে হারাতে হলে হয়তো পাগল হয়ে যাবে সে। চায়ের কাপটা একপাশে বেঞ্চির উপর নামিয়ে রেখে মোবাইলের রঙ উঠে যাওয়া কিবোর্ড চেপে চেপে মেসেজ লেখে শফিউল – “ভালোই হয়েছে, এবারে হতে পারে চাকরিটা”, তারপর আবার চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে চুমুক দেয়।

চা শেষ হয়ে গেলে আরও কিছুক্ষন সেই বেঞ্চের উপরেই বসে থাকে সে। অফিসপাড়ার ব্যস্ত দুপুরের মধ্যে কেমন একরকম নেশা আছে। কিসের নেশা সেটা ঠিক বুঝতে না পারলেও সময়টা ভাল লাগে তার, আশেপাশের সবার মাঝেই কেমন একটা ব্যস্তসমস্ত ভাব, যেন একটু দেরি হয়ে গেলেই ট্রেন ছুটে যাবে। “কিরে সেন্টু, বেচা কেনা হইল কিছু?”- ডাকটা শুনে ঘোর কাটল শফিউলের। চেয়ে দেখল চায়ের দোকানদার একটু দুরের সেই পাগলটাকে লক্ষ্য করেই প্রশ্নটা করেছে। জবাবে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল পাগলটা, সেটা ঠিক বোঝা না গেলেও তার মাথা নাড়ার ধরন দেখে বোঝা গেল বিক্রি ভাল না কথাটাই বলেছে সে। খানিকটা কৌতুহল বোধ হল শফিউলের, খানিকটা হাসিও পেল- “পাগলের বাতিল মালের দোকান” । হাত নেড়ে পাগলটাকে কাছে ডাকল দোকানদার। কাছে আসতে দোকান থেকে একটা পাউরুটি তার দিকে এগিয়ে দিয়ে দোকানদার বলল – “নে এইডা, খাইয়া ল”। জীর্ন নোংরা হাত বাড়িয়ে পাউরুটিটা নিল পাগলটা, তারপর ছেঁড়া প্যান্টের পকেটে ভরে রাখল। “কিরে খাইবি না?” – জিজ্ঞেস করল দোকানদার। শফিউল অবাক হয়ে লক্ষ্য করল এই প্রশ্নে পাগলটার মুখে কেমন যেন একটু লজ্জার ভাব দেখা গেল। সেই লজ্জা মাখা মুখে কাঁচুমাচু হয়ে পাগলটা বলল – “তুলিরে দিমুনে এইডা”, তারপর ফিরে গিয়ে আবার সেই তার বাতিল মালের দোকানের সামনে বসে পড়ল।

খুব দ্রুত একের পর এক ঘটে গেল সবকিছু, শফিউল ভারি অবাক হল পাগলের কান্ড দেখে। মনের কৌতুহলটা এবারে আর চেপে রাখা গেল না। পাগলটা চলে যেতে চাওয়ালা কে ডেকে জিজ্ঞেস করল

– মামা চেনেন নাকি একে?

জবাবে দোকানদার একটু হেঁসে বলল

– হ মামা, চিনুম না ক্যান। মন্টু পাগলা, আমাগো বস্তিতেই থাকত আগে, মুদির দোকান চালাইত।

– পাগল হল কিভাবে?

– ওই তুলির লাইগাই পাগল হইছে।

– তুলি কে?

– তুলিও আমাগো বস্তিতেই থাকত। হেগো দুইজনের বিয়া হওনের কথা আছিল। কিন্তু হইল না, শেষে মন্টু গেল পাগল হইয়া।

এই পর্যন্ত শুনে শফিউল বাকিটা শোনার আগ্রহ হারাল, প্রেমে ব্যার্থ এমন পাগল যে বাংলাদেশে কত লক্ষ আছে কে জানে! পকেটের থেকে টাকা বের করে চায়ের দাম দিয়ে উঠতে গিয়ে আচমকা একটা প্রশ্ন এল শফিউলের মনে, শেষে চাওয়ালাকে জিজ্ঞেস না করে পারল না প্রশ্নটা

– মামা তুলির সাথেতো মন্টুর বিয়ে হয়নি, তবে ও তুলির জন্য পাউরুটি নিয়ে গেল কেন?

– পাগলের কাজ কারবার মামা, তুলিরে ও পাইব কই?

– কেন? তার কি বিয়ে হয়ে গেছে?

– আরে না মামা, তুলি তো সেই কবেই মইরা গেছে। বছর আষ্টেক আগে যেবার আমাগো বস্তিতে আগুন লাগলো, হেই আগুনে পুইড়া মরছে। মন্টুর দোকানটাও পুইড়া গেছিল। তারপর থেইকাই তো মন্টু পাগল হইল। দেহেন না পাগলের কাম, দোকান সাজায়ে বইসা থাকে সারাদিন…

চাওয়ালার বাকি কথাগুলো আর ঠিকমত কানে গেল না শফিউলের। আহারে জীবন, আহারে প্রেম। মানুষের জীবন কতই না অনিশ্চিত, অসহায়, তবু এর পরতে পরতে কত আশার গল্প, কত ভালবাসার গল্প। ধীর পায়ে হেঁটে পাগলটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল শফিউল, তারপর জিজ্ঞেস করল- চিপস কত করে?হাতের দশ আঙুল তুলে মন্টু পাগল বলল- কুড়ি ট্যাকাপকেট থেকে শেষ কুড়ি টাকার নোটটা বের করে মন্টু মিয়ার দিকে বাড়িয়ে ধরল শফিউল। টাকাটা নিয়ে তার বদলে একটা ফেলে দেওয়া চিপসের প্যাকেট তুলে দিল মন্টু। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে যত্ন করে ভাজ করে মানিব্যাগে রেখে দিল শফিউল। তারপর তানিয়ার বাসার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো, এই মুহুর্তে তানিয়াকে খুব খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তার, তানিয়াকে হারানোর ভয়ে বুকের ভিতর কেমন একটা চিনচিন ব্যাথা করছে…