বায়োমেট্রিক প্রেম

১।।

সকাল নয়টা থেকে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে আনিকা। শুরুতে তার সামনে পঞ্চাশ জন মত মানুষ ছিল। এখন এই দুই ঘন্টাতে লাইন তো কমেই নি, বরং বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। সোমবার দিন, অফিসে না গিয়ে সকাল সকাল লাইনে এসে দাঁড়িয়ে আনিকা ভেবেছিল দশটা নাগাদ কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু না, আসলে সব মানুষই তার মত করেই চিন্তা করে। তাইতো সরকার থেকে যেদিন দুই মাস সময় দিয়ে মোবাইল সিম বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধনের ঘোষণা করা হল, সেদিন অন্য সকলের মত আনিকাও খবরটাকে কোন গুরুত্বই দেয় নি। আজ করি, কাল করি করে করে আজকে ঘোষিত সময়সীমার শেষ দিন। নিবন্ধন না করলে সিম বন্ধ হয়ে যাবে, আর বর্তমান সময়ে একটা দিনও মোবাইল ফোন ছাড়া কাটানো শুধু কঠিনই নয়, রীতিমত অসম্ভবই বলা চলে । লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আনিকা দেখল তার পাশের ছেলেদের লাইন থেকে একটা ছেলে তার দিকে কেমন ড্যাব ড্যাব করে তাকাচ্ছে। একবার মনে হল ছেলেটাকে আগেও কোথাও দেখেছে, কিন্তু মনে করতে পারল না আনিকা। তার অস্বস্তি লাগতে লাগল। এই কারনেই আনিকা শিহাবকে বলেছিল তার সাথে আসতে। শিহাব তার খুব ভাল বন্ধু, ঠিক ভাবে বললে শুধু ভাল বন্ধু না, অনেকদিন থেকেই তারা একে অপরকে ভালবাসে। কিন্তু শিহাবের অফিসে আজকে নাকি কি জরুরি মিটিং আছে, তাই সে আসতে পারে নি। শিহাব সাথে থাকলে কত ভাল হত সেকথা ভাবতে ভাবতে ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আনিকা আবার লাইনে মন দিল।

২।।

আনিকার মত জাহিদও সকাল থেকে বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধনের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। পাশাপাশি দুটো লাইন। একটা ছেলেদের, আর একটা মেয়েদের। মেয়েদের লাইনটা অপেক্ষাকৃত বড়। এই ঘটনা স্বাভাবিক না। কিভাবে এটা হল সেটা ভাবতে গিয়ে জাহিদ সিদ্ধান্তে আসল, লোকজন সবাই মেয়েদের লাইন ছোট হবে ভেবে যার যার মা , বোন, বউ, প্রেমিকা এদেরকে পাঠিয়েছে সিম নিবন্ধন করতে। ভাবতেই হাসি পেল জাহিদের। ঢাকা শহরে জাহিদ একাই থাকে, তাই মা বোনও নেই, বিয়ে সে করেনি, আর ভাগ্যিস কোন প্রেমিকাও তার নেই। প্রেমে অবশ্য জাহিদ একবার পড়েছিল, ভার্সিটি লাইফে, রসায়ন বিভাগের আনিকা নামের একটা মেয়ের। কিন্তু জাহিদের কোন ভবিষ্যৎ নেই বলে আনিকা তাকে ফিরিয়ে দেয়।লাইনে দাঁড়িয়ে জাহিদ এইসব ভাবছিল, আর এদিক সেদিক তাকাচ্ছিল। হঠাৎ এক অদ্ভুদ ব্যাপার। জাহিদ দেখল তার পাশের মেয়েদের লাইনে একটু সামনেই হুবুহু আনিকার মত একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমটায় জাহিদ ভাবল সে ভুল দেখেছে। কিন্তু আর একটু ভাল করে খেয়াল করতেই বুঝতে পারল মেয়েটা আনিকাই। এই কবছরে বেশ একটু মোটা হয়েছে, আর একটু ফর্সাও হয়েছে। আনিকাও একবার জাহিদের দিকে তাকাল। কিন্তু মনে হল না সে জাহিদকে চিনতে পেরেছে। অবশ্য ভার্সিটির পর অনেক দিন দেখা হয়নি। আর ভার্সিটিতে থাকতে জাহিদ ছিল বোহেমিয়ান, মুখ ভর্তি চুল দাঁড়ির জঙ্গল। এখন চাকরির ভাইবা দেয়া লাগে, তাই চুল দাঁড়ি কেটে ফেলেছে। জাহিদ একবার ভাবল নিজে যেচে গিয়ে কথা বলবে, কিন্তু আচমকা যানজট থেকে সদ্য ছাড়া পাওয়া সিএনজির মত কোথা থেকে একরাশ সংকোচ এসে তার সে ইচ্ছেটাকে চাপা দিয়ে মেরে দিল।

৩।।

প্রায় বারোটা বাজে বাজে, অবশেষে আনিকার অপেক্ষার প্রহর শেষ হল। লাইন কমে কমে আনিকার পালা এল নিবন্ধনের। ডেস্কের লোকটা তার কিছু তথ্য শুনে নিয়ে তার দিকে একটা ট্যাব এগিয়ে দিল আঙ্গুলের ছাপ দেবার জন্য। ছাপ দিয়ে আনিকা হাফ ছেড়ে বাঁচল, মনে মনে ভাবল আর না, শেষ দিনে লাইনে দাঁড়ানোর ভুল সে আর কখনও করবে না। কিন্তু না, ভোগান্তি যদি কপালে লেখা থাকে তবে তাকে খন্ডায় কার সাধ্যি? ডেস্কের লোকটা মৃদু হেসে বলল- ম্যাডাম , আপনার আঙ্গুলের ছাপ আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে মিলছে না। আনিকার মাথায় যেন আকাশ ভাঙ্গার জোগাড় হল। লোকটা বলে কি ? মিলছে না মানে কি? উপর্যুপরি আরও দুবার ছাপ দেবার পরও সেটা মিলল না। ওদিকে দেরি দেখে পিছনের মানুষ হইচই শুরু করেছে। তাই আনিকা একটু পাশে সরে এসে শিহাবকে কল করল। শিহাব কল রিসিভ করতে আনিকা তাকে পুরোটা বুঝিয়ে বলে শেষে বলল – প্লিজ শিহাব, তুমি একটু এসে তোমার আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে আমার সিমটা নিবন্ধন করে দিয়ে যাও। আনিকা ভেবেছিল শিহাব স্বাভাবিক ভাবেই মেনে নিয়ে কাজটা করবে। কিন্তু উত্তরে শিহাব বলল – পিলিজ, আমাকে এই অনুরোধ করো না, তোমার সিমের দায়িত্ব আমি নিতে যাব কেন? একথা শোনার পর আনিকার মাথায় সত্যি সত্যি যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। কি করবে সে এখন, ঢাকায় তার চেনা জানা এমন কেউ নেই যে তাকে সাহায্য করবে ।

৪।।

জাহিদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন হয়ে গিয়েছিল। সে তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আনিকার ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিল। শেষটায় না পারতে জাহিদ আনিকার দিকে এগিয়ে গেল। সামনে গিয়ে কি বলবে ভেবে না পেয়ে বলল – কেমন আছ আনিকা ? আনিকা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল – কে আপনি ? কি চান ? জাহিদ থতমত খেয়ে গেল। আমতা আমতা করে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল – আমি জাহিদ, ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট। চিনতে পারছ ? এবারে আনিকা তাকে চিনতে পারল, ভীষণ অবাক হল। অতপর আমাদের জাহিদ সব সংকোচ কাটিয়ে আনিকাকে বলল – তোমাকে চিন্তা করতে হবে না, তোমার সিম আমি আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে নিবন্ধন করে দেব।এই কথার জবাবে আনিকা কি বলবে ভেবে পেল না। আনন্দে তার চোখের কোনে পানি এসে গেল। মনে মনে আনিকা ভাবল, যাকে সে এতদিন ভালবেসেছে সে তার সিমের দায়িত্ব নিল না! আর যাকে সে একদিন ফিরিয়ে দিয়েছিল সে আজ তার সিমের দায়িত্ব নিচ্ছে ! গভীর কৃতজ্ঞতায় আনিকার মন ভরে গেল। ওদিকে জাহিদের বুকের মাঝেও তোলপাড় চলছে। তবে কি এতদিন পর এসে তার আর আনিকার মাঝে কিছু একটা হবে? ঠিক এমন সময় ডেস্কের থেকে একজন লোক এগিয়ে এসে আনিকাকে বলল – ম্যাডাম, আমরা অনেক দুঃখিত। আসলে আমাদের ওই ট্যাবটার ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানারটা কাজ করছে না। আপনি এই ট্যাবটাতে একবার আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে চেষ্টা করুন ।